একজন মায়ের দীর্ঘশ্বাস, একটি সন্তানের পরিচয়ের সংকট এবং প্রায় তিন দশকের অপেক্ষা—এ যেন এক পরিবারের না-বলা বেদনার গল্প। পিতৃপরিচয় ও পৈতৃক অধিকারের দাবিতে আজও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় রয়েছেন ঈদগাঁও উপজেলার ইসলামাবাদ ইউনিয়নের নূর নাহার। তার দাবি, প্রায় ৩০ বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার কারণে তার সন্তান আজও প্রকৃত পিতৃপরিচয়ের প্রশ্নের মুখোমুখি।
নূর নাহারের অভিযোগ, কক্সবাজার ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে কর্মরত হামিদুর রহমানের পূর্ব বোয়ালখালী, জলদাসপাড়া এলাকার বসতবাড়িতে তিনি গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। সে সময় হামিদুর রহমান তাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন বলে দাবি করেন তিনি।
নূর নাহারের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় দুই থেকে তিন মাস ধরে পরিবারের অন্য সদস্যদের অগোচরে হামিদুর রহমান প্রায় প্রতিরাতেই তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করতেন। একপর্যায়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন এবং তার গর্ভে হামিদুর রহমানের সন্তান আসে বলে দাবি করেন নূর নাহার।
তবে গর্ভধারণের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায় বলে অভিযোগ তার। নূর নাহারের দাবি, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর হামিদুর রহমানের বাবা-মা তাকে ওই বাড়ি থেকে বের করে দেন।
পরবর্তীতে স্থানীয়ভাবে বিচার-শালিসের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেখানে হামিদুর রহমান ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয় বলে দাবি নূর নাহারের। এরপর তাকে অর্থের বিনিময়ে অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নূর নাহারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের পরও তার দুর্ভোগের অবসান হয়নি। গর্ভের সন্তানের বিষয়টি জানতে পেরে তার স্বামীও তাকে ছেড়ে চলে যান। একদিকে স্বামীর পরিত্যাগ, অন্যদিকে সমাজের নানা প্রশ্ন ও অবহেলা—সব মিলিয়ে চরম অসহায় অবস্থায় পড়েন তিনি।
জন্মের পর নাম রাখা হয় ফোরকান
নূর নাহারের দাবি, সন্তান জন্মগ্রহণের পর তার নাম রাখা হয় ফোরকান। কিন্তু মাত্র তিন বছর বয়সে চরম অসহায় পরিস্থিতির কারণে তাকে অন্যের কাছে দত্তক দিতে বাধ্য হন তিনি।
নূর নাহারের বক্তব্য অনুযায়ী, করুল্ল্যাহ বহ ও নুরুল্লাহ শিশুটিকে দত্তক নেন এবং পরবর্তীতে তার নাম রাখেন নূরুল আবছার।
বর্তমানে নূরুল আবছারের বয়স প্রায় ২৯ থেকে ৩০ বছর। দীর্ঘ সময় ধরে দত্তক পরিবারের স্নেহ-ভালোবাসায় বেড়ে উঠলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে নিজের প্রকৃত পিতৃপরিচয় জানার আকাঙ্ক্ষা আরও গভীর হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
নূরুল আবছারের আকাঙ্ক্ষা—তিনি তার প্রকৃত বাবা কে, তা জানতে চান। একই সঙ্গে তিনি ফিরে পেতে চান তার পৈতৃক পরিচয় ও আইনসম্মত অধিকার।
নূর নাহারের ভাষ্য অনুযায়ী, নূরুল আবছার দত্তক বাবা-মায়ের ভালোবাসাকে অস্বীকার করতে চান না। তবে নিজের জন্মপরিচয় ও প্রকৃত পিতৃপরিচয়ের প্রশ্নটি তার কাছে আলাদা এক বাস্তবতা। তিনি আর মায়ের জীবনের পুরোনো কষ্ট ও অপমানের বোঝা বহন করতে চান না; বরং সত্যটি জানতে চান এবং নিজের পৈতৃক পরিচয়ের স্বীকৃতি পেতে চান।
‘আমি আমার দাদুর বাড়িতে ফিরতে চাই’
নূর নাহারের দাবি, তার সন্তান এখন তার কথিত পিতার পৈতৃক সূত্রের সন্ধান করছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নূরুল আবছারের আকাঙ্ক্ষা—সে তার কথিত দাদু গোলাম নবীর বাড়িতে যেতে চায় এবং নিজের শেকড় ও পরিবারের পরিচয় জানতে চায়।
প্রায় তিন দশক পর একজন প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের এই ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নতুন করে সামনে এনেছে পুরোনো সেই প্রশ্ন—নূরুল আবছারের প্রকৃত বাবা কে?
নূর নাহারের দাবি, বিষয়টি শুধু তার ব্যক্তিগত কষ্টের নয়; এটি তার সন্তানের পরিচয়, মর্যাদা ও পৈতৃক অধিকারের সঙ্গেও জড়িত।
সত্য উদঘাটনের প্রত্যাশা
নূর নাহারের বক্তব্যের একটি ভিডিও ফুটেজ রয়েছে, যেখানে তিনি তার জীবনে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে তার উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রকৃত পিতৃপরিচয় নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করা জরুরি।
নূর নাহারের দাবি, তিনি কারও করুণা চান না। তিনি চান সত্যের স্বীকৃতি, সন্তানের পিতৃপরিচয় এবং ন্যায়বিচার।
অন্যদিকে প্রায় ৩০ বছর বয়সী নূরুল আবছারের সামনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন—তার জন্মদাতা বাবা কে? কোথায় তার পৈতৃক শেকড়?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আইনসম্মতভাবে প্রয়োজনীয় তদন্ত, প্রমাণ যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের দাবি উঠেছে।
একজন মায়ের দীর্ঘদিনের কান্না আর একজন সন্তানের পরিচয়ের আকাঙ্ক্ষা—শেষ পর্যন্ত কি তাদের নিয়ে যাবে সত্যের কাছে? নাকি পিতৃপরিচয়ের অপেক্ষায় আরও দীর্ঘ হবে এই পরিবারের পথচলা?