সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ন্যায় কক্সবাজার জেলার নব গঠিত ঈদগাঁও থানাকেও কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং জনপরিসরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কোন অপরাধ সংঘটিত হলেই অনেকের মাঝে প্রাথমিকভাবেই প্রশ্ন উত্তাপিত হয়- পুলিশ কী করছিল? কিংবা থানা কেন ব্যবস্থা নেয়নি?। কিন্তু বাস্তবতা হলো- আইন, সংবিধান এবং প্রচলিত বিধি-বিধানের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সব অপরাধের দায় একতরফাভাবে থানা-পুলিশের উপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত যেমন নয়, তেমনি আইনসম্মতও নয়।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা শুধুমাত্র পুলিশের একক দায়িত্ব নয় বরং এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং নাগরিকের সমন্বিত দায়িত্ব। পুলিশ জনগণের সহযোগী, জনগণের বিকল্প নয়। বাংলাদেশে প্রায় ১৮ কোটিরও অধিক মানুষের বিপরীতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। অপরদিকে প্রতিদিন সংঘটিত হওয়া অপরাধ, সামাজিক বিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, ভূমি বিরোধ, সাইবার অপরাধসহ বহুমাত্রিক সমস্যার পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বাস্তবতায় প্রতিটি ব্যক্তি, প্রতিটি পরিবার কিংবা প্রতিটি এলাকায় কী ঘটছে তা আগে থেকেই জানা বা প্রতিরোধ করা পুলিশের পক্ষে বাস্তবিক অর্থে সম্ভব নয়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের উপলব্ধি করতে হবে- পুলিশ আইন দ্বারা পরিচালিত একটি সংস্থা। তারা কোন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রতিষ্ঠান নয়। আইন তাদের যে ক্ষমতা দিয়েছে, তারা কেবল সেই ক্ষমতার মধ্যেই দায়িত্ব পালন করতে পারে। পুলিশ রেগুলেশন বেঙ্গল (P.R.B), ফৌজদারি কার্যবিধি, দণ্ডবিধি এবং অন্যান্য বিশেষ আইনের বাইরে গিয়ে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সেটি আবার ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে গণ্য হবে এবং এ নিয়ে স্বয়ং পুলিশ কর্মকর্তাদের বিজ্ঞ আদালতে এসে কারণ দর্শাতে হয়!
আমরা প্রায়শই এমন প্রত্যাশা করি যেন পুলিশ আইনগত সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে তাৎক্ষণিকভাবে সব সমস্যার সমাধান করে ফেলবে। কিন্তু বাস্তবে একজন police কর্মকর্তাকে প্রতিটি পদক্ষেপ গ্রহণের আগে আইন, বিধি এবং আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হয়। আইন লঙ্ঘন করে কোন কাজ করলে পরবর্তীতে সেই কর্মকর্তাকেই জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, অধিকাংশ ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে কোন না কোন অভিযোগকারী, তথ্যদাতা বা সংবাদদাতার প্রয়োজন হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির কাঠামোই এমন যে, কোন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সংবাদ, অভিযোগ বা তথ্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিকট পৌঁছাতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী, प्रत्यक्षদর্শী কিংবা স্থানীয় জনগণ যদি তথ্য গোপন করেন অথবা অভিযোগ দায়ের না করেন, তাহলে পুলিশের পক্ষে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আমাদের সমাজে এমন একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, যে কোন অপরাধ সংঘটিত হলেই থানা- পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা দায়ের করতে বাধ্য। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ নিজ উদ্যোগে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু প্রতিটি ঘটনায় তা সম্ভব নয় কিংবা আইনও তা অনুমোদন করে না। বিশেষত ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তিগত বিরোধ কিংবা নির্দিষ্ট অভিযোগভিত্তিক অপরাধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন- অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগে যদি পুলিশ নির্ভরযোগ্য তথ্য পায়, তাহলে তারা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে অপরাধ প্রতিরোধের চেষ্টা করে। কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি গোপনে অপরাধের পরিকল্পনা করে, রাতের অন্ধকারে অপরাধ সংঘটিত করে অথবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে না জানিয়ে অপরাধ সংঘটনের পরিবেশ তৈরি করে, তাহলে সেই অপরাধ সংঘটিত হওয়ার দায় সম্পূর্ণরূপে পুলিশের উপর বর্তানো যুক্তিসঙ্গত নয়। এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ বিবেচনা করা যেতে পারে- যেমন কোন এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলমান। স্থানীয় লোকজন বিষয়টি জানলেও থানাকে অবহিত করেনি। পরবর্তীতে সেখানে মারামারি, হত্যাকাণ্ড বা গুরুতর সংঘর্ষ ঘটে গেল। তখন যদি বলা হয়- “পুলিশ কিছুই করেনি”, তাহলে প্রশ্ন আসে, পুলিশ কি আগে থেকেই ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত ছিল? জনগণ কি তাদের দায়িত্ব পালন করে যথাসময়ে তথ্য প্রদান করেছিল?
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা অনেক সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা গ্রহণ করি না; কিন্তু কোন ঘটনা ঘটলেই তাদের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় তুলি। অথচ তথ্য প্রদান, সাক্ষ্য দেওয়া, অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা, তদন্তে সহযোগিতা করা এবং আদালতে সত্য বক্তব্য প্রদান- এসব ক্ষেত্রেও নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে যাচাই-বাছাই ছাড়া থানার বিরুদ্ধে কিংবা কোন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রচার করা একটি বিপজ্জনক প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে একদিকে যেমন জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত সদস্যদের মনোবলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, কোন কোন ক্ষেত্রে পুলিশের ভুল, অবহেলা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার ঘটতে পারে। আইনের শাসনের স্বার্থে সেসব ঘটনার অবশ্যই সমালোচনা হওয়া উচিত এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সমালোচনা হতে হবে তথ্যনির্ভর, দায়িত্বশীল এবং ন্যায়সঙ্গত। কোন নির্দিষ্ট ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বাস্তবতা যাচাই ছাড়া গোটা পুলিশ বাহিনী কিংবা একটি থানাকে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
বর্তমান সময়ে ঈদগাঁও থানাকে ঘিরে যে আলোচনা হচ্ছে, সেখানে আমাদের সবার উচিত আবেগ নয়, আইন ও বাস্তবতার আলোকে বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা। মনে রাখতে হবে, পুলিশ জনগণের শত্রু নয়; বরং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই রাষ্ট্র তাদের দায়িত্ব দিয়েছে। অপরাধ দমনে পুলিশের সফলতা যেমন প্রশংসার দাবিদার, তেমনি জনগণের সহযোগিতা ছাড়া তাদের পক্ষে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করাও সম্ভব নয়।
একজন আইনজীবী হিসেবে আমার পেশাগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অনেক ক্ষেত্রে জনগণ সময়মতো অভিযোগ প্রদান করেন না, সাক্ষ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেন কিংবা তদন্তে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেন না; অথচ পরবর্তীতে সম্পূর্ণ দায়ভার পুলিশের উপর চাপিয়ে দেন। বাস্তবতা হলো, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা একটি যৌথ দায়িত্ব। পুলিশ, আদালত ও জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তাই সমালোচনা অবশ্যই হোক, তবে তা যেন তথ্যভিত্তিক, আইনসম্মত ও দায়িত্বশীল হয়।
অতএব, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে আমাদের উচিত অযৌক্তিক ও আইনবহির্ভূত সমালোচনার পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। অপরাধের সংবাদ গোপন না করা, প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করা, তদন্তে সহায়তা করা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা- এসবই একটি নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণের পূর্বশর্ত। কারণ থানা–পুলিশকে প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার হিসেবে দেখতে শিখতে হবে। কারণ একটি সত্য কখনো অস্বীকার করা যাবে না- জনগণের সহযোগিতা ছাড়া পুলিশ সফল হতে পারে না, আর কার্যকর পুলিশি সহায়তা ছাড়া কোনো সমাজ দীর্ঘমেয়াদে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারে না।