দেশে বিদ্যুৎ সাশ্রয় অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু মানুষের জীবন-জীবিকা ধ্বংস করে নয়!!
সন্ধ্যার পর দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়াই যদি একমাত্র সমাধান হতো, তাহলে পৃথিবীর কোন দেশেই জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজা হতো না। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের প্রয়োজন হলে ব্যবসায়ীরা হারিকেন- ল্যাম্পূ, চেরাগ, সোলার লাইট, আইপিএস কিংবা জেনারেটরের সাহায্যে ব্যবসা চালাবে। কষ্ট করবে, খরচ বাড়বে, তবুও চেষ্টা করবে পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে। কিন্তু কোন অবস্থাতেই লাখো ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও তাদের পরিবারের মুখের অন্ন কেড়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত একটি স্বাধিন - সার্বভৌম রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আমরা সবাই হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর সেই শিক্ষণীয় ঘটনাটি নিশ্চয়ই জানি। একজন ভিক্ষুককে তিনি শুধু ভিক্ষা করতে নিষেধ করেননি; বরং তার হাতে একটি কুড়াল তুলে দিয়ে হালাল উপায়ে উপার্জনের পথ দেখিয়েছিলেন। কারণ প্রকৃত নেতৃত্ব মানুষের পথ বন্ধ করে না, বরং নতুন পথ তৈরি করে দেয়।
আজও সেই শিক্ষা সমানভাবে প্রযোজ্য। বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে হবে- এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। কিন্তু তার জন্য যদি সন্ধ্যার পর দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকান কর্মচারী, দিনমজুর ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের উপর। যে মানুষটি সারাদিন অফিস বা কর্মস্থলে কাটিয়ে সন্ধ্যায় বাজারে যান, পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনেন, তার জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলার নাম কি উন্নয়ন বা সাশ্রয় হতে পারে?
দুঃখজনক হলেও সত্য, ইতিমধ্যে অনেক ব্যবসায়ীকে সন্ধ্যার পর দোকানপাট খোলা রাখার অভিযোগে হাজার হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এমনকি গতকাল আমাদের বৃহত্তর ঈদগাঁও বাজারেও দুইটি দোকানের মালিক'কে প্রায়ই ২০,০০০/= (বিশ হাজার) টাকা জরিমানা করা হয়েছে! একদিকে বিদ্যুৎ সংকটের অজহাতে ব্যবসার সময় সীমিত করে তাদের আয়-রোজগারের পথ সংকুচিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে বেঁচে থাকার তাদিগে দোকান খোলা রাখলে তাদের উপর আর্থিক শাস্তি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ যেন সত্যিই মরার উপর খাঁড়ার ঘা! যে ব্যবসায়ী সারাদিন ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থাকে, সংসারের খরচ, দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন ও ব্যাংক ঋণের চাপ সামলাতে হিমশিম খায়, তার কাঁধে আবার জরিমানার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কোন সভ্য ও মানবিক সমাধান হতে পারে না।
প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব মানুষের জীবনকে সহজ করা, কঠিন করা নয়। জনগণের আয়-রোজগারের পথ সংকুচিত করে নয়, বিকল্প ব্যবস্থা সৃষ্টি করেই সংকট মোকাবেলা করতে হয়। কারণ অর্থনীতির চাকা থামিয়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যায়, কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষের কান্না থামানো যায় না।
তাই অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রতি অনুরোধ জানাই-বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় রেখে এমন একটি বাস্তবসম্মত ও মানবিক ব্যবস্থা গ্রহণ করুন, যাতে একদিকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়, অন্যদিকে ব্যবসায়ী, কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এই ব্যবসায়ী সমাজকে সংকটের বোঝা বহন করার সুযোগ দিন, কিন্তু তাদের রুটি-রুজির পথ অনুগ্রপূর্বক বন্ধ করে দেবেন না।
মনে রাখতে হবে- সমস্যা যত বড়ই হোক, সমাধান কখনো মানুষের রুটি-রুজি বন্ধ করে হতে পারে না। জনগণকে বাঁচিয়ে রেখে, ব্যবসা সচল রেখেই সংকটের মোকাবেলা করতে হবে। এটাই মানবিকতা, এটাই বাস্তবতা, এটাই দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয়।