কক্সবাজার প্রতিনিধি: কক্সবাজারের ঈদগাঁওয়ে পৈত্রিক কৃষিজমি দখলকে কেন্দ্র করে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এক আইনজীবী ও তাঁর পরিবারের ওপর হামলা, হত্যাচেষ্টা এবং প্রাণনাশের হুমকির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, গত ৭ ও ৮ আগস্ট পরপর দুই দিন Islamabad ইউনিয়নের পূর্ব বোয়ালখালী এলাকায় তাদের পৈত্রিক কৃষিজমিতে প্রবেশ করে ফসল নষ্ট, জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা এবং আইনজীবী এডভোকেট আনোয়ার পারভেজ রুবেলকে লোহার রড দিয়ে মাথায় আঘাতের চেষ্টা করা হয়। পরদিন তাঁকে উদ্দেশ্য করে প্রকাশ্যে ‘মেরে ফেল’ নির্দেশ দেওয়ারও অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনার দ্বিতীয় দিনের একটি ভিডিও ভুক্তভোগী পক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাদের দাবি, ভিডিওটি ইতোমধ্যে ১ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি ভিউ অতিক্রম করেছে। ভিডিওটি নিয়ে ঈদগাঁওসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপক আলোচনা চলছে।
জমিতে ফসল নষ্ট ও দখলের চেষ্টার অভিযোগ
ভুক্তভোগী পক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, হামিদুর রহমান (পিতা—মৃত গোলাম নবী), লুৎফর রহমান (পিতা—মৃত গোলাম নবী), সাজ্জাত হোসেন (পিতা—মনজুর আলম) ও মো. রিফাত (পিতা—মো. আলমগীর) বিরোধীয় পৈত্রিক কৃষিজমি দখল ও রোপণ করা ধান ও অন্যান্য ফসল নষ্ট করার চেষ্টা করেন।
ঘটনাটি গত ৭ আগস্ট ২০২৬, শুক্রবার সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে ঘটে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। এ সময় জমির মালিকপক্ষের ওমর পারভেজ ওরফে প্রফেসর ড. রুমেল এবং তাঁর ভাই এডভোকেট আনোয়ার পারভেজ রুবেল ঘটনাস্থলে গিয়ে বাধা দেন।
অভিযোগ রয়েছে, এ সময় তাদের সঙ্গে অভিযুক্তদের বাকবিতণ্ডা ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে হামিদুর রহমান তাঁর নিকটস্থ বসতবাড়ি থেকে একটি লোহার রড নিয়ে এডভোকেট আনোয়ার পারভেজ রুবেলের মাথা লক্ষ্য করে আঘাত করেন। ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি, রুবেল দ্রুত সরে যাওয়ায় রডের আঘাত সরাসরি মাথায় লাগেনি এবং তিনি গুরুতর আঘাত থেকে রক্ষা পান।
পরদিন আবারও জমিতে দলবদ্ধ উপস্থিতি
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, প্রথম দিনের ঘটনার পরদিন ৮ আগস্ট সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে অভিযুক্তরা আবারও দলবদ্ধভাবে লাঠিসোটা নিয়ে একই জমিতে প্রবেশ করেন। এ সময় জমিতে রোপণ করা ফসল পদদলিত করে নষ্ট এবং খুঁটি স্থাপনের মাধ্যমে জমি দখলের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করতে করতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন ওমর পারভেজ ও এডভোকেট আনোয়ার পারভেজ রুবেল।
‘রুবেলকে মেরে ফেল’—নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ
ভুক্তভোগী পক্ষের অভিযোগ, দ্বিতীয় দিনের ঘটনার সময় হামিদুর রহমান অপর তিনজনকে উদ্দেশ্য করে এডভোকেট আনোয়ার পারভেজ রুবেলকে মারধর করার নির্দেশ দেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, ঘটনার সময় মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিওতে ওই বক্তব্যসহ ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধারণ হয়েছে। এরপর রুবেলকে আক্রমণের চেষ্টা করা হলে স্থানীয় উপস্থিত লোকজন তাঁকে অভিযুক্তদের কাছ থেকে সরিয়ে নেন বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
প্রাণনাশ ও লাশ গুমের হুমকির অভিযোগ
ভুক্তভোগী পক্ষ আরও দাবি করেছে, ঘটনার পর অভিযুক্তরা তাদের উদ্দেশে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেন। তাদের অভিযোগ, ‘দেখে নেব’, ‘মারব-কাটব’ এবং ‘লাশ গুম করে দেব’—এ ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। পরপর দুই দিনের ঘটনায় আইনজীবী পরিবারটির মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল
দ্বিতীয় দিনের ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভুক্তভোগী পক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফেসবুকে ভিডিওটি ইতোমধ্যে ১ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি ভিউ অতিক্রম করেছে। ভিডিওতে জমি নিয়ে বিরোধ, উত্তেজনাকর পরিস্থিতি এবং আইনজীবীকে মারধরের হুমকিসহ বিভিন্ন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
অভিযুক্তদের পরিচয় নিয়েও আলোচনা
ভুক্তভোগী পক্ষের অভিযোগে হামিদুর রহমানকে কক্সবাজারের ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের একজন কর্মকর্তা এবং লুৎফর রহমান-কে ইসলামী ব্যাংকের মহেশখালী শাখার একজন কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া সাজ্জাত হোসেন ও মো. রিফাতের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে বলেও ভুক্তভোগী পক্ষ দাবি করেছে। তবে অভিযুক্তদের সামাজিক ও পেশাগত পরিচয় এবং কিশোর গ্যাং-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তদন্ত কর্মকর্তার ঘটনাস্থল পরিদর্শন
ঘটনার বিষয়ে থানায় অভিযোগ করার পর ১১ আগস্ট ২০২৬, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বলে ভুক্তভোগী পক্ষ জানিয়েছে। এ সময় তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি উপস্থিত সাক্ষী ও স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন বলে জানা গেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
‘নিরপেক্ষ তদন্ত চাই’
ওমর পারভেজ ওরফে প্রফেসর ড. রুমেল বলেন, “আমাদের পৈত্রিক ও দখলীয় জমিতে জোরপূর্বক প্রবেশ করে রোপণ করা ফসল নষ্ট করা হয়েছে। বাধা দিতে গেলে আমার ভাই, একজন আইনজীবীকে লোহার রড দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। পরদিন আবার প্রকাশ্যে তাকে মেরে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।”
তিনি বলেন, “ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শী রয়েছেন। আমরা চাই, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হোক এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
আইনগত সমাধানের দাবি
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে তা আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা উচিত। কোনো পক্ষেরই জোরপূর্বক জমি দখল, ফসল নষ্ট, হামলা কিংবা প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে একজন আইনজীবীকে লোহার রড দিয়ে আঘাতের চেষ্টা এবং প্রকাশ্যে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এদিকে ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, পরপর দুই দিনের ঘটনায় তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংঘাত বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
বেঙ্গল মিররের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।